
আপডেটঃ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ | নভেম্বর ২৬, ২০২৫
১৫ মাস আগে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিটিভিতে এখনো রয়ে গেছে তার দোসর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রভাব। বিভাগীয় তদন্ত, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং দুদকের অনুসন্ধানে সুস্পষ্ট দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণবশত তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা বিটিভির গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, বিটিভিতে এখনো এমন একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে যারা পতিত সরকারের পলাতক প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের ঝুঁকি তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে—তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিভির কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ‘ম্যানেজ’ করেই এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তদন্তের বাইরে থাকছেন। এনএসআই, দুদক ও বিটিভির নিজস্ব তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মেলাধারাও সেই প্রতিবেদনগুলো সচিব বা উপদেষ্টার টেবিলে তুললেও লালফিতার ফাঁদে আটকে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।তথ্য নিতে সচিব মাহবুবা ফারজানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সচিবের বক্তব্য চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। জনসংযোগ কর্মকর্তার পরামর্শে একান্ত সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের পরও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ আলতাফ-উল-আলমের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা ও দুদকে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের কপি সূত্রে জানা যায়—৬ নভেম্বর যাচাই-বাছাই শেষে প্রেরিত এক প্রতিবেদনে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার (চলতি দায়িত্ব) মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি বিটিভির সিগন্যাল সিস্টেম ডিজিটাল করার প্রকল্পে কারসাজি করে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেন। প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই ঘুসের বিনিময়ে বিল পরিশোধের প্রমাণও পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে দুদক তার সম্পদ বিবরণ তলব করে। যদিও বর্তমানে তাকে আগে বিএনপি মতাদর্শী পরিবারের পরিচয় পুঁজি করে রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দাপটের সঙ্গে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রের নির্বাহী প্রযোজক ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সফির হোসাইনের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্তে ‘নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। সাত পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে—তিনি সরকারি আদেশ ছাড়াই চট্টগ্রাম কেন্দ্রে অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন এবং নিজেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করে সরকারি অর্থ ব্যয় করেছেন। তার আচরণকে সরকারি চাকরি শৃঙ্খলা বিধিমালার পরিপন্থি উল্লেখ করেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এছাড়া ঢাকা কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক মোহাম্মাদ সেলিমের বিরুদ্ধে এনএসআইর প্রতিবেদনে অবৈধ অর্থ লেনদেন, অতিরিক্ত খরচ দেখানো ও ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিটিভির পূর্বের সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন বলেই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দুদক আরও জানিয়েছে, মনিরুল ইসলাম, জিল্লুর রশিদ ও আফিফা আফরোজের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনো চলছে।
বিটিভির ভেতরের পরিবেশ নিয়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে হলেও বিটিভিতে দুর্নীতির প্রভাব এখনো কমেনি—বরং তদন্ত চলমান থাকায় কিছু কর্মকর্তা নানাভাবে তদবির করে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই বিষয়ে মনিরুল ইসলামকে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো অভিযোগ জানেন না বলে দাবি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। সফির হোসাইনকেও একাধিকবার ফোন এবং বার্তা পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে বিটিভিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরাপদ করা এখন সময়ের দাবি। নইলে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা দুটোই হুমকির মুখে পড়বে।
IPCS News : Dhaka :