
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রতিবছর ৬ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। দিবসটি শুধু সেরিব্রাল পালসি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির দিন নয়; বরং এ অবস্থায় থাকা শিশু ও ব্যক্তিদের অধিকার, সক্ষমতা, মর্যাদা এবং সমাজে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
সেরিব্রাল পালসি (CP) একটি স্নায়বিক অবস্থা, যা সাধারণত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশকালীন ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং নড়াচড়া, পেশির নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য ও অঙ্গভঙ্গিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। কারও হাঁটাচলায় সমস্যা হতে পারে, আবার কারও কথা বলা, হাতের সূক্ষ্ম কাজ, খাবার গ্রহণ কিংবা দৈনন্দিন কার্যক্রমেও নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সেরিব্রাল পালসি কখনোই একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
সেরিব্রাল পালসি নিয়ে এখনো সমাজে নানা ভুল ধারণা, ভয় ও সামাজিক চাপ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর বিকাশে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেও পরিবার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন গ্রহণে দেরি করে। অথচ শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সঠিক মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ শুরু করা গেলে তার কার্যক্ষমতা ও স্বাধীনতা অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেরিব্রাল পালসিতে ফিজিওথেরাপির লক্ষ্য শুধু শিশুকে হাঁটানো নয়; বরং তার সামগ্রিক কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা। পেশির শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য, সমন্বয়, অঙ্গভঙ্গি এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনতা বাড়ানোর জন্য ব্যক্তিভেদে থেরাপি পরিকল্পনা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী গেইট ট্রেনিং, ব্যায়াম, স্ট্রেচিং, পজিশনিং, স্ট্রেংথেনিং ও মোবিলিটি ট্রেনিংসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে শুধু থেরাপি সেশনই যথেষ্ট নয়। একটি শিশুর উন্নয়নে পরিবার, ফিজিওথেরাপিস্ট, চিকিৎসক, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, শিক্ষক এবং সমাজের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুটিকে তার সীমাবদ্ধতার জন্য নয়, বরং তার সম্ভাবনার জন্য দেখতে হবে।
সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুকে অতিরিক্ত সুরক্ষার নামে সব কাজ থেকে দূরে রাখা তার স্বাধীনতা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বরং নিরাপদ পরিবেশে তাকে নিজের মতো করে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নিজে বসতে পারা, খেলনা ধরতে পারা, কয়েক পা হাঁটতে পারা কিংবা নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারাও তার জন্য বড় অর্জন।
বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবসের মূল বার্তা তাই—অক্ষমতার দিকে নয়, সক্ষমতার দিকে নজর দিতে হবে। একটি শিশুর শরীর হয়তো কিছু কাজে সীমাবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তার শেখার ক্ষমতা, অনুভূতি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ নয়।
এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুকে করুণা নয়, সুযোগ দেওয়া হবে; উপেক্ষা নয়, গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া হবে। তাদের সীমাবদ্ধতার পরিচয়ে আটকে না রেখে সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।
“পুনর্বাসনের লক্ষ্য শুধু একজন মানুষকে হাঁটতে শেখানো নয়—তাকে যতটা সম্ভব স্বাধীন, আত্মনির্ভর এবং সমাজের সক্রিয় অংশ হয়ে উঠতে সহায়তা করা।”
এমন প্রত্যাশা ও অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবসে আমাদের বার্তা হোক—
লেখক:
তানজিম কামাল তারেক
৪র্থ বর্ষ, বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি
বিএইচপিআই, সিআরপি