• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০১:০৩ পূর্বাহ্ন |
  • English Version
ব্রেকিং নিউজঃ
বিশ্বকাপ উন্মাদনায় নারায়ণগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ২০ প্রাণহানির সেই মামলার বিচার আজও শেষ হয়নি মোবাইল দিয়ে প্রতিদিন ৫০০ ৭০০ টাকা ইনকাম করার সহজ উপায় বন্দরে গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ বাবা-মা-ছেলে একসঙ্গে না ফেরার দেশে নরসিংদীতে ফাহিম হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ ফের আলোচনায় রূপগঞ্জে বেনজীরের সেই ডুপ্লেক্স বাড়ি আড়াইহাজারে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার নরসিংদীতে সাংবাদিকের বাসায় দুর্ধর্ষ চুরি, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট ফতুল্লা থেকে অপহৃত ২ বছরের শিশু উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২ স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান: মনোহরদীতে দুই হাসপাতালে জরিমানা

২০ প্রাণহানির সেই মামলার বিচার আজও শেষ হয়নি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০১:০৩ পূর্বাহ্ন


১৬ জুন ২০০১। নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও রক্তাক্ত দিন। শনিবার বিকেলে শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে চলছিল দলীয় সভা। নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল পুরো এলাকা। হঠাৎ একের পর এক শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারপাশ। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও আশপাশের এলাকা।

 

সেই ভয়াবহ হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষসহ ২০ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান-সহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। ঘটনার ২৫ বছর পূর্ণ হলেও এখনো মামলার বিচার সম্পন্ন হয়নি। দীর্ঘ তদন্ত, রাজনৈতিক পালাবদল, অভিযোগপত্র নিয়ে বিতর্ক এবং বিচারিক জটিলতায় মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

 

যেভাবে ঘটেছিল হামলা

 

ঘটনার দিন বিকেলে চাষাঢ়ার আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলীয় সভা চলছিল। বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সভা চলাকালে কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশে কয়েকটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই বহু মানুষ হতাহত হন। পুরো শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

 

হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল হাসান বাপ্পী, তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আক্তার হোসেন, সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, এবিএম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, চা বিক্রেতা হালিমা বেগমসহ মোট ২০ জন।

 

এছাড়া গুরুতর আহতদের মধ্যে ছিলেন শামীম ওসমান, তার ব্যক্তিগত সহকারী চন্দন শীল এবং যুবলীগ কর্মী রতন দাস। আহতদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন।

 

মামলা ও তদন্তের দীর্ঘ পথচলা

 

হামলার পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিএনপির তৎকালীন নেতা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার ও শওকত হাশেম শকুসহ ২৭ জনকে আসামি করা হয়।

 

তবে ২০০৩ সালে তদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, এজাহারভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

 

এরপর নিহত হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে শামীম ওসমান, নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমানসহ ৫৮ জনকে আসামি করে পাল্টা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে সেই মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।

 

সিআইডির পুনঃতদন্ত ও নতুন অভিযোগপত্র

 

২০০৯ সালে আদালতের নির্দেশে মামলাটির পুনঃতদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৩ সালে ৯৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়।

 

অভিযোগপত্রে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, ওবায়দুল্লাহ রহমান, আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন এবং বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকু।

 

তবে ২০২০ সালে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে শামীম ওসমান অভিযোগপত্রের সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, অভিযোগপত্রে এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা প্রকৃতপক্ষে জড়িত নন, আবার প্রকৃত অপরাধীদের কেউ কেউ বাদ পড়েছেন। একই সময়ে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, তৈমুর আলম খন্দকার ও শওকত হাশেম শকুর সম্পৃক্ততা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।

 

রায় ঘোষণার আগেই নতুন জটিলতা

 

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালে মামলার রায়ের জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু রায় ঘোষণার আগেই নতুন জটিলতা তৈরি হয়।

 

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, সম্পূরক অভিযোগপত্রের মূল কপি আদালতে দাখিল না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে। আদালত তার পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে মামলাটির রায় আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

 

এ পর্যন্ত হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলাগুলোতে ৩৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার পুনঃসাক্ষ্য শেষে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে নতুন করে রায়ের দিন নির্ধারণ করা হবে।

 

এখনও বিচারহীনতার বেদনা

 

চাষাঢ়ার বোমা হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত নাশকতার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও হামলার শিকার পরিবারগুলো এখনো চূড়ান্ত বিচার পায়নি। নিহতদের স্বজন ও আহতরা বারবার দ্রুত বিচার সম্পন্নের দাবি জানিয়ে আসছেন।

 

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো ১৬ জুন এলেই ফিরে আসে সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি—রক্ত, ধ্বংসস্তূপ আর স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস। ২০ প্রাণহানির সেই ভয়াবহ বোমা হামলার বিচার কবে শেষ হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।




আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

Most Viewed Posts