• শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন |
  • English Version

খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে সাংবাদিকদের উপর দালালদের হামলা

Reporter Name / ৩৪ Time View
Update : শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন


নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতাল আবারও আলোচনায় এসেছে দালাল চক্র, রোগী হয়রানি এবং সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে সক্রিয় একটি দালাল চক্রের অনিয়ম ও রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক। এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বাইরে থেকে চিকিৎসা, পরীক্ষা কিংবা ওষুধ নিতে বাধ্য করে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে হাসপাতালের সেবার পরিবেশও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গত ৫ আগস্টের পর হাসপাতালটিতে মুক্তি নামের এক কর্মকর্তা বদলি আসে। এই কর্মকর্তা আগেও এই হাসপাতালে ছিল। বদলী হয়ে আসার পর থেকেই হাসপাতালের ভেতর একটি নতুন দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ওই স্টাফের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছত্রছায়ায় কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি হাসপাতালের রোগীদের টার্গেট করে নানা কৌশলে হয়রানি করে আসছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও অজ্ঞ রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে হামলার শিকার হন নারায়ণগঞ্জ টাইমসের হাসপাতাল প্রতিনিধি সাংবাদিক মেহেদী হাসান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতরে তথ্য সংগ্রহের সময় তাকে ঘিরে ধরে কয়েকজন ব্যক্তি। একপর্যায়ে তাকে অবরুদ্ধ করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়।

ঘটনার সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা জানান, মেহেদী হাসান মোবাইল ফোনে সহকর্মীদের বিষয়টি জানালে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিক দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তারাও অভিযুক্তদের রোষানলে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা অভিযোগ করে বলেন, আমরা জনগণের স্বার্থে, হাসপাতালের অনিয়ম তুলে ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। এটা শুধু সাংবাদিকদের ওপর হামলা নয়, এটি সত্য ও তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত।

এ ঘটনায় স্থানীয় রাজীব নামে এক ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে। সাংবাদিকদের দাবি, হামলাকারীদের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং পুরো ঘটনায় সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিক সমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রশাসনের সহায়তা চান ভুক্তভোগীরা। খবর পেয়ে র‍্যাব-১১ এবং পুলিশের একাধিক টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তদের কয়েকজন এলাকা ত্যাগ করে। তবে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান জানান, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাদের অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজনও দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, হাসপাতালের গেটে প্রবেশের পর থেকেই কিছু লোক এসে বিভিন্ন পরামর্শ দিতে থাকে এবং দ্রুত সেবা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে তাদের কথায় রাজি হয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেন।

এক রোগীর স্বজন বলেন, আমরা হাসপাতালে এসে বুঝতেই পারি না কে আসল স্টাফ, আর কে দালাল। অনেক সময় তারা এমনভাবে কথা বলে, মনে হয় হাসপাতালেরই লোক। পরে বুঝি প্রতারণার শিকার হয়েছি।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। সেখানে যদি দালালদের দৌরাত্ম্যে রোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং সাংবাদিকরা অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সাংবাদিক নেতারাও এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং হাসপাতাল থেকে দালাল চক্র নির্মূলের দাবি জানিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদ জানান, এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি বিল্লাল হোসেন রবিন জানান, দ্রুত এই দালাল চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে প্রশাসনকে। যেখানে দালালদের কাছে সংবাদকর্মীরা নিরাপদ নয় সেখানে সাধারণ রোগীদের অবস্থা অনুমান করা যায়। হাসপাতালে রোগীদের প্রকৃত সেবা পেতে দ্রুত দালাল চক্রের মূল উৎপাটন করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

খাতা-কলমে হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার নিরাপদ স্থান হলেও বাস্তবে খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে ঘিরে দালালদের সক্রিয়তা বহুদিনের অভিযোগ। এবার সেই অনিয়ম তুলে ধরতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জনমনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রসঙ্গত: গত ২২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও র‌্যাব-১১ হাসপাতালে যৌথ অভিযান চালিয়ে ৪ দালালকে আটক করে । পরে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে ৩ জনকে কারাদন্ড ও একজনকে অর্থদন্ড দেয়া হয়।

কিন্তু কয়েকদিন পর আবার সক্রীয় হয় দালাল চক্র। এ নিয়ে ১১ মে মঙ্গলবার “৩০০ শয্যা হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য: কারাদন্ডেও মিলছে না সুফল” শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রচার হয়। ফলে সংবাদকর্মীদের উপর ক্ষুদ্ধ হয় দালাল চক্র।




আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

Most Viewed Posts