• সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৩:০০ পূর্বাহ্ন |
  • English Version

শিশুর অধিকার: টেকসই সমাজের অঙ্গীকার&# 39;

Reporter Name / ৫ Time View
Update : সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৩:০০ পূর্বাহ্ন


শিশু কেবল একটি পরিবারের সদস্যই নয় সে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তার সুস্থ বিকাশ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুর অধিকার কোনো অনুকম্পা নয়-এটি তার জন্মগত ও স্বীকৃত মানবাধিকার। প্রথমত একজন শিশুর রয়েছে কিছু সাধারণ অধিকার। আন্তর্জাতিকভাবে শিশুর অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকৃত হয়েছে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে। এই সনদে শিশুর অধিকার চারটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

 

ক) বেঁচে থাকার অধিকার অর্থ্যাৎ শিশুর খাদ্য, পুষ্টি, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার রয়েছে। সুস্থ দেহ ও মন ছাড়া কোনো শিশুই তার সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বিকাশ করতে পারে না। খ) শিশুর বিকাশের অধিকার অর্থ্যাৎ শিশুর শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা, সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশের সুযোগ থাকা আবশ্যক। তার চিন্তা ও প্রতিভা বিকশিত হওয়ার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন। গ) শিশুর সুরক্ষার অধিকার অর্থাৎ শিশুকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও ডিজিটাল সকল ধরনের নির্যাতন, শোষণ ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। ঘ) শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার অর্থাৎ শিশু তার বয়স ও পরিপক্বতার উপযোগী বিষয়ে মতামত প্রকাশ করতে পারবে এবং সেই মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। UNICEF-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব দেশে শিশুদের এই চারটি অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়, সেসব দেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।

 

এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে শিশুর অধিকার। যেমন: (i) মানসম্মত শিক্ষার অধিকার অর্থাৎ শিশুর এমন শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে যা তার বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়ক। শুধুমাত্র বইভিত্তিক শিক্ষা নয় বরং সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও নৈতিকতা চর্চাও এর অন্তর্ভুক্ত। (ii) নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ অর্থাৎ বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তি, মানসিক হয়রানি বা বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। প্রতিটি শিশুকে সমান মর্যাদা ও সম্মান দিতে হবে। (iii) অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অর্থাৎ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

UNESCO-এর Global Education Monitoring Report অনুযায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের শেখার ফলাফল ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। Harvard University-এর Center on the Developing Child-এর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক বয়সে নিরাপদ, সহায়ক ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের জ্ঞানীয় ও সামাজিক দক্ষতা দীর্ঘমেয়াদে বেশি শক্তিশালী হয়। এছাড়া World Bank-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মানসম্মত শিক্ষা ও শিশুর অধিকার রক্ষা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

 

শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর অধিকার বাস্তবায়নে এবং সঠিক অগ্রগতির জন্য বিদ্যালয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিভাবকের ভূমিকাও অপরিহার্য। যেমন- ১. শিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, অভিভাবক সভায় অংশগ্রহণ করা এবং সন্তানের শিক্ষাগত অবস্থা সম্পর্কে আপডেট নেওয়া জরুরি। ২. শেখার পরিবেশ তৈরি: বাড়িতে পড়াশোনার উপযোগী শান্ত পরিবেশ তৈরি করা, সময় ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।৩. শিশুর মানসিকঅবস্থার খোঁজ রাখা অর্থাৎ শিশু যেন শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়েই মূল্যায়িত না হয়। তার আবেগ, আত্মবিশ্বাস, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক-এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ৪. ইতিবাচক উৎসাহ অর্থ্যাৎ অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে শিশুকে উৎসাহ দেওয়া উচিত। ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানো প্রয়োজন। ৫. নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা অর্থাৎ শিশুকে সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে পরিবারকেও ভূমিকা নিতে হবে। শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, বিদ্যালয় ও রাষ্ট্র এই তিনটি স্তম্ভের সমন্বয় জরুরি-পরিবার শিশুকে ভালোবাসা, মূল্যবোধ ও নিরাপত্তা দেয়। বিদ্যালয় তাকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে। রাষ্ট্র আইন, নীতি ও সুরক্ষার কাঠামো নিশ্চিত করে।

 

শিশুর অধিকার রক্ষা মানে কেবল আইন মানা নয়; এটি মানবিক দায়িত্ব। এটি কোনো সাময়িক কর্মসূচি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। একটি শিশু যখন নিরাপদ, সম্মানজনক ও সহায়ক পরিবেশে শিক্ষা লাভ করে, তখন সে কেবল একজন ভালো শিক্ষার্থী নয়-একজন সচেতন নাগরিক হয়ে ওঠে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও রাষ্ট্র-এই ত্রিমাত্রিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই শিশুর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। কারণ আজকের সুরক্ষিত, শিক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ শিশু-আগামীর আলোকিত সমাজের ভিত্তি। একটি শিশুর হাসি কেবল একটি পরিবারের আনন্দ নয়, তা একটি জাতির আশার প্রতীক। শিশুর অধিকার রক্ষা মানেই টেকসই সমাজের ভিত্তি সুদৃঢ় করা।

 

লেখক 

ড. মো: বিল্লাল হোসেন

উপাধ্যক্ষ

মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ




আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

Most Viewed Posts