
নারায়ণগঞ্জের অপরাধ জগতের ইতিহাসে একসময় আতঙ্কের নাম ছিল দেলোয়ার হোসেন দেলু ওরফে মাস্টার দেলু। সময়ের ব্যবধানে সেই জায়গায় এখন আলোচনায় উঠে এসেছে মাসদাইর এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী জাহিদ। দুই সময়ের দুই ব্যক্তিকে ঘিরে এলাকাবাসীর মধ্যে একই ধরনের আতঙ্ক, একই ধরনের অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকায় র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মাস্টার দেলু।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার, মাদক ব্যবসায়ী ও পেশাদার কিলার। তার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, খুন, রাহাজানি ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত এক ডজন মামলা ছিল। তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ ছিল।
অন্যদিকে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর, ঘোষেরবাগ ও গলাচিপা এলাকায় অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন জাহিদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী ও মাদক চক্র। এই চক্রের সদস্যরা মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা ও অস্ত্রের মহড়া দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে।
জাহিদের অপরাধের খন্ডচিত্র
ফতুল্লার মাসদাইর, ঘোষেরবাগ, গলাচিপা এলাকাতে একচ্ছত্রভাবে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক হলেন জাহিদ। দুর্ধর্ষ এ জাহিদের নেতৃত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী ও ডাকাত।
তাদের একজন মনির হোসেন। কিন্তু দুর্ধর্ষ প্রকৃতির হওয়াতে নাম জুড়ে যায় ফাইটার মনির। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারী বিকেলে ফতুল্লার গলাচিপা চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় ফাতেমা ইয়াসমিন শিল্পীর মালিকানাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশী চালিয়ে মাদক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার জব্দ করে আইনশৃংখলাবাহিনী।
গত বছরের ১৮ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাসদাইর এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাহিদ, সুমনসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সেলিম ওরফে কসাই সেলিম, রাসেল ওরফে কসাই রাসেল, কাজল, রিয়াদ শাওন, সানি, হাসান সহ ১৫-২০ জনের মাদক কারবারিরা দেশীয় তৈরি অস্ত্র নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা হ্যান্ডকাফ পরিহিত আটককৃত চার মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনিয়ে নেয় এবং গাড়ী ভাংচুর করে। মাদক কারবারিদের হামলায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কনেস্টেবল আহত হয়।
২৪ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সামছুল হক সরকার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাসদাইর ঘোষের বাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার করতে যান। জাহিদকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা যখন ফিরে আসছিলেন, তখনই পেছন থেকে জাহিদের সহযোগীরা এসআই সামছুল হক সরকারের ডান হাতের কনুইয়ের সামান্য নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।
১৫ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপর ছুরিকাঘাত ও গুলির ঘটনা ঘটায় জাহিদ ও তার সহযোগীরা।
১৬ নভেম্বর বিকেলে সন্ত্রাসী জাহিদকে গ্রেপ্তারে তৎপর হয় র্যাব-১১ এর একটি গোয়েন্দা দল। দলটি ফতুল্লার মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় পৌঁছালে জাহিদ ও তার সহযোগীরা র্যাবের গোয়েন্দাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছুড়ে। এসময় ছোড়া গুলি স্থানীয় এক বাড়ির রান্নাঘরে থাকা জবা আক্তার (২২) এর বুকে এসে লাগে। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সবশেষ চলতি বছরের ৫ মে মাসদাইর বোয়ালিয়া খাল এলাকাতে দিনে-দুপুরে র্যাবের উপর হামলা করে একদল দুর্বৃত্ত। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায় একদল অস্ত্রধারী র্যাবের সাদা পোশাকে থাকা সদস্যদের উপর হামলা করে। এ ঘটনার পর ফের আলোচনায় আসে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ি জাহিদের নাম।
এদিকে মাস্টার দেলুর সময়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক অভিযোগ ছিল। একইভাবে জাহিদের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুলি, হামলা ও অভিযানে বাধা দেওয়ার
অভিযোগ। গত বছর তার গুলিতে এক নারী আহত হওয়ার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এছাড়া পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে বাধা সৃষ্টি এবং আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই সময়ের এই দুই আলোচিত ব্যক্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য হচ্ছে—দুজনই নিজেদের এলাকায় ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে অনুসারী বাহিনী, যারা মাদক ব্যবসা ও সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
তবে পার্থক্য হলো, মাস্টার দেলুর অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছিল র্যাবের অভিযানে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু জাহিদ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বারবার অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। অনেকের প্রশ্ন—নারায়ণগঞ্জ কি আবারও আরেক ‘মাস্টার দেলু’র উত্থান দেখছে?