• বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন |
  • English Version

গুম ছিল ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল: চীফ প্রসিকিউটর

Reporter Name / ২৪২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, বিরোধী চিন্তার মানুষদের গুম করে তিলে-তিলে অক্ষম করে দেওয়ার মাধ্যমে উগ্র বসনা বাস্তবায়ন করেছিল আওয়ামী লীগ। গুম ছিল ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) আওয়ামী লীগের শাসনামলে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সাবেক বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যদের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। বিকেল পর্যন্ত এ জবানবন্দি চলে। জেরার জন্য আগামী ২৬ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে। ব্যারিস্টার আরমানও দীর্ঘ আট বছর গুম ছিলেন। তিনি এ মামলার প্রথম সাক্ষী।

সাক্ষ্য শুরুর আগে সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বিরোধী চিন্তার মানুষদের গুম করে তিলে তিলে অক্ষম করে দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকল্পের যে উগ্র বাসনা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার পথে দেশের প্রধান কয়েকটি নিরাপত্তা বাহিনীর একদল সদস্য মার্সেনারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ফলে খোদ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা নজিরবিহীন। মানুষ হিসেবে মানুষের যে ন্যূনতম মর্যাদা থাকে, বলপূর্বক গুম সেই মর্যাদাকে সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক আইনে বলপূর্বক গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ এটি একযোগে বহু অধিকার ধ্বংস করে।

তিনি আরও বলেন, হাসিনার রাষ্ট্রকল্পে গুমের কৌশল মানুষকে কেবল দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে দেহকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা চিরতরে অক্ষম করে দিয়েছে। এখানে মৃত্যু ঘটানো হয় না প্রকাশ্যে, বরং মানুষকে ঝুলিয়ে রাখা হয় জীবিত ও মৃতের মাঝখানে। পরিবার জানে না সে বেঁচে আছে কি না? এ অপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি শুধু ভুক্তভোগীকে নয়, পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়। একজন মানুষ গুম হলে তার পরিবার প্রতিদিন বিচারহীনতার কারাগারে বন্দি থাকে। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এমনকি প্রতিবেশীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকতে শেখে। এ অনিশ্চয়তা গুমের রাজনৈতিক কার্যকারিতা। এটি ভয় উৎপাদন করে, নীরবতা সৃষ্টি করে ও প্রতিরোধকে ভেঙে দেয়। এর মধ্যদিয়ে টিকে থাকে ফ্যাসিবাদি শাসন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হাসিনার আওয়ামী জাতিবাদি রাষ্ট্রকল্পে গুমের উদ্দেশ্য শুধু লাশ লুকানো ছিল না। বরং ভয় উৎপাদন আর ফ্যাসিবাদ দীর্ঘ করণের এক ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্রীয় মার্সেনারি যখন কাউকে হত্যা করে, তখন একটি লাশ থাকে। লাশ মানে সাক্ষ্য, জানাজা, কবর, স্মৃতি। কিন্তু যখন কাউকে গুম করা হয়, তখন লাশ থাকে না, সাক্ষ্য থাকে না, কবর থাকে না, থাকে শুধু প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলোই ভুক্তভোগী পরিবার জানতে চায় দিনের পর দিন। এমনকি বছরের পর বছর। সে কি বেঁচে আছে? কোথায় আছে? ফিরবে কি না? বন্দিদের স্ত্রীদের প্রশ্ন ছিল, আমি কি সধবা নাকি বিধবা?

তাজুল ইসলাম বলেন, বলপূর্বক গুমের নির্মম ইতিহাসে এই আদালত একা নয়। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা বহু আগেই দেখেছে গুম কিভাবে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনে, চিলির পিনোশে শাসনে, লাতিন আমেরিকার ডার্টি ওয়ার-এ, বলপূর্বক গুম ছিল প্রধান দমননীতির হাতিয়ার। সেসব দেশ পরে স্বীকার করেছে, গুম শুধু ভুক্তভোগীকে ধ্বংস করে না, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকেও দুর্বল করে দেয়। কারণ যে বাহিনী আইনের বাইরে কাজ করতে শেখে, সে বাহিনী শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যও অনিরাপদ হয়ে ওঠে। এই ট্রাইব্যুনাল যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে রাষ্ট্র শিখবে যে, তার নাগরিকদের কোনো অবস্থায় গুম করা যায় না। আজ এই আদালতে আমরা শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজছি না, কিংবা গুম হয়ে থাকা ব্যক্তিদের যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের জন্য সান্ত্বনা খুঁজছি না। আমরা খুঁজছি মানবিকতার সীমারেখা, যেটি বারংবার লঙ্ঘিত হয়েছে এসব অপরাধের কারণে। আমরা খুঁজছি জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার সেই দৃষ্টান্ত। যার ফলে গুমের মতো ঘৃণ্য অপরাধ আর কোনো দিনও যেন মাথা তুলতে না পারে এই বাংলাদেশে।




আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

Most Viewed Posts