• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০২:১৯ অপরাহ্ন |
  • English Version
ব্রেকিং নিউজঃ
নারায়ণগঞ্জে খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন ফতুল্লার পাগলায় ডাকাতির লুন্ঠিত স্বর্ণালংকারসহ গ্রেপ্তার ৩ আড়াইহাজারে মাদকসহ আটক ৪ জনকে নিয়ে কারিশমা ফতুল্লায় অস্ত্রের মুখে হাত-পা বেঁধে ১৪০ পিছ ব্যাটারি লুট জুলাই বিপ্লব ছিল জনগণের, কোনো রাজনৈতিক দলের সিড়ি হওয়ার জন্য নয়: প্রভাত সাংবাদিকদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান সাংবাদিক ইউনিয়নের যারা দোকান বিক্রি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সাখাওয়াত বন্দরের দেউলী চৌরাপাড়া খেলার মাঠ রক্ষায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের নিয়তিই যেন ‘নীরব কান্না’ নারায়ণগঞ্জে মহান মে দিবসে বর্নাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভা

অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের নিয়তিই যেন ‘নীরব কান্না’

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০২:১৯ অপরাহ্ন


কয়েক বছর আগে, বাগেরহাটের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান মোহাম্মাদ মোসলেম জীবিকার তাগিদে ঘর ছেড়েছিলেন। অন্য অনেক শ্রমিকের মতো তিনিও স্বপ্ন দেখেছিলেন—দিন শেষে কিছু টাকা হাতে নিয়ে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ একটু ভালো করবেন। সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি কাজ করতে গিয়েছিলেন ফেনীর একটি নির্মাণ প্রকল্পে। কাজও করেছিলেন বেশ কিছুদিন। তবে তার আয় ও সুখের প্রত্যাশা দীর্ঘ হয়নি।

কাজ করার সময় হঠাৎ একটি কংক্রিট মিশ্রণ মেশিন উল্টে তার ওপর পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় মোসলেম উদ্দিনের। মুহূর্তেই থেমে যায় একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের জীবনসংগ্রাম। জীবিকার সন্ধানে ঘর ছাড়া সেই মানুষটি স্ত্রী-সন্তানদের কাছে আর জীবিত ফিরতে পারেননি।

মোসলেমের মৃত্যুর পর ঠিকাদার পক্ষ থেকে তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় মাত্র ২০ হাজার টাকা—মরদেহ বাড়িতে নেওয়া ও দাফনের খরচ বাবদ। এর বাইরে আর একটি টাকাও পায়নি পরিবারটি। নেই কোনো ক্ষতিপূরণ, নেই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আশ্বাস।

আজ মোসলেমের পরিবার অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছে। যে মানুষটি সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার যেন অন্ধকারে ডুবে গেছে। ঘরে অভাব, সন্তানদের চোখে অনিশ্চয়তা, আর স্ত্রীর বুকভরা আতঙ্ক—কীভাবে চলবে তাদের আগামী দিনগুলো?

মোসলেমের গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের লাখো শ্রমিকের জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা আসলে কোনো ক্ষতিপূরণ পাই না। আগামীকাল কাজ করতে পারবো কি না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ ঠিকাদার যে কোনো সময় কাজ দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন।—নির্মাণশ্রমিক শাহিন গাজী

ঠিক একইভাবে দুর্ঘটনার শিকার হন বাসের হেলপার বরিশালের সাব্বির, যিনি রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে থাকেন। কর্মরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয় তাকে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষের কাছ থেকে তিনি কোনো চিকিৎসা সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাননি।

বরং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার দৈনিক আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, তাদের কর্মব্যবস্থায় ছিল নিষ্ঠুর এক নিয়ম—‘কাজ নেই, বেতনও নেই’।

সাব্বিরের ছিল না কোনো নিয়োগপত্র, ছিল না লিখিত চুক্তি, এমনকি নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামোও ছিল না। ফলে আইনি অধিকার থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তিনি কোনো দাবি তুলতে পারেননি। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে পরিবারটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। একদিকে শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে অভাবের চাপ—দুই দিক থেকেই ভেঙে পড়েন তিনি।

মোসলেম ও সাব্বির—শুধু দুটি নাম নয়; তারা বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের লাখো শ্রমিকের প্রতিচ্ছবি। নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, গৃহকর্মী—অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, অথচ তাদের অধিকাংশের নেই কোনো আইনি সুরক্ষা।

দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে তারাই সবচেয়ে বেশি ঘাম ঝরান। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গড়ে তোলেন শহর, সেতু, ভবন ও শিল্পকারখানা। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা মৃত্যুর মুখে পড়লে তারা হয়ে যান সবচেয়ে অসহায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ‘লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তি ৬৯ দশমিক ১০ মিলিয়ন, যার মধ্যে ৫৮ দশমিক ০৪ মিলিয়ন বা প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত।

এই শ্রমিকদের মধ্যে দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত। যাদের অধিকাংশেরই নেই লিখিত চুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বা আইনি সুরক্ষা।

বিবিএসের তথ্য বলছে, নারী শ্রমিকদের ৯৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং পুরুষ শ্রমিকদের ৭৮ দশমিক ০৮ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। মোট অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির মধ্যে ১৩ দশমিক ২২ মিলিয়ন শহরে এবং ৪৪ দশমিক ৮২ মিলিয়ন গ্রামে কর্মরত। এছাড়া কৃষিখাতে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের হার প্রায় ৯৭ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮৯ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৬৭ শতাংশ।

এ অবস্থায় দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে আয় বৈষম্য এবং শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ। যেখানে নেই তাদের আইনি সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা।

কোনো শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ জানাবে, সে ব্যবস্থাও সহজ ও কার্যকর হতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।—সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে কর্মরত নির্মাণশ্রমিক শাহিন গাজী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা দৈনিক  মজুরির ভিত্তিতে কাজ করি। কাজ করলে মজুরি পাই, কাজ না থাকলে বেকার।’

তিনি বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা আসলে কোনো ক্ষতিপূরণ পাই না। আগামীকাল কাজ করতে পারবো কি না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ ঠিকাদার যে কোনো সময় কাজ দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন।’

‘আমাদের নির্দিষ্ট কোনো মজুরি নেই—কখনো দিনে ৭০০ টাকা পাই, আবার কখনো ৫০০ টাকা; যা কাজের ধরন, চাহিদা ও মৌসুমের ওপর নির্ভর করে’—বলেন শাহিন গাজী।

তিনি এর কারণ হিসেবে বলছিলেন, অধিকাংশ শ্রমিকের নেই কোনো নিয়োগপত্র, চুক্তি, বিমা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা। ফলে দুর্ঘটনার পর পরিবারগুলো প্রমাণই করতে পারে না যে তাদের স্বজন কোথায় এবং কার অধীনে কাজ করতেন। এই সুযোগে অনেক মালিক সহজেই দায় এড়িয়ে যান।

বর্তমানে যে শ্রম অধিকার কাঠামো রয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সীমিত সংখ্যক শ্রমিকের জন্য কার্যকর। অথচ দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক এখনো এই সুরক্ষার বাইরে—এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন একটি সর্বজনীন জাতীয় মানদণ্ড, যা সব ধরনের শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য হবে। সেটা গৃহশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক বা কারখানার শ্রমিক—যেই হোক না কেন।’

প্রত্যেক শ্রমিকের কাজের নিশ্চয়তা, পরিচয়পত্র, পেশাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এবং সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান এ শ্রমিক অধিকার কর্মী।

সুলতান আহমেদের ভাষ্য, ‘কোনো শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ জানাবে, সে ব্যবস্থাও সহজ ও কার্যকর হতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।’

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প বলছে, বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করছে, শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের পেছনে যাদের শ্রম ও ঘাম, সেই শ্রমিকদের জীবন এখনো অনিরাপদ, অনিশ্চিত ও অবহেলিত।

শ্রমিকের সুরক্ষা এবং অর্থনীতিক উন্নয়ন সাধিত না হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

‘একজন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণ হারানো নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া এবং একজন মা বা স্ত্রীর আজীবনের কান্না হয়ে থাকা’—বলছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ভয়। অনেক সময় ইউনিয়ন করার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়। মামলা, হামলা ও প্রশাসনিক জটিলতাও থাকে। ফলে শ্রমিকরা ভয় পেয়ে যায়।—নাজমা আক্তার

তিনি মনে করেন, ‘শ্রমিকরা অর্থনীতি ও শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা তারা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যে খাতেই কাজ করুক না কেন। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য আমাদের শ্রমিকদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা ও ন্যায্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।’

‘শ্রমিকরা যদি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেকার হয়ে পড়ে এবং কাজে ফেরার জন্য যথাযথ চিকিৎসা না পায়, তবে তারা দেশের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে’—যোগ করেন জাহিদ হোসেন।

অনানুষ্ঠানিক খাতের বাইরে, আনুষ্ঠানিক খাতেও শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তবে বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের শিল্প প্রতিনিধিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তারা শ্রমিক কল্যাণ ও অধিকার সংক্রান্ত সব আইন ও বিধি মেনে চলেন।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ভয়। অনেক সময় ইউনিয়ন করার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়। মামলা, হামলা ও প্রশাসনিক জটিলতাও থাকে। ফলে শ্রমিকরা ভয় পেয়ে যায়।’

তিনি ইউনিয়ন করার অধিকার সহজ ও নিরাপদ করার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘এই ভয় এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা শ্রম আইনগুলোর কোনো ধারা লঙ্ঘন করিনি; বরং শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে অনেকক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সুবিধা দিয়ে থাকি। আমাদের সদস্যরাও সব নিয়ম মেনে চলেন। তাছাড়া, বৈশ্বিক ক্রেতারা এ বিষয়ে এখন অনেক বেশি সক্রিয়। ফলে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন করে কোনো নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

এই খবরটি আপনার বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

Most Viewed Posts