
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর, দেওভোগ ও কাঠেরপুল এলাকাজুড়ে মাদক ব্যবসার বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এসব এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রভাব বিস্তার করে প্রকাশ্যেই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন অবাধ বাণিজ্য চললেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এলাকাগুলো ধীরে ধীরে ‘মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিণত হচ্ছে।
মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় পারুলি ওরফে হান্ডেড পারুল নামে এক নারী মাদক ব্যবসায়ীকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরদার বাড়ির সামনে অবস্থিত একটি নির্দিষ্ট স্পট থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদকের বেচাকেনা চলে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এই স্পটে। আশপাশের তরুণদের একটি অংশ এই মাদকচক্রের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে বলেও তারা জানান। একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিদিনই এখানে নতুন নতুন মুখ দেখা যায়। বাইরের এলাকা থেকেও ক্রেতারা আসে। এটা এখন ওপেন সিক্রেট।
আরও অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমঝোতা রয়েছে। যদিও এই বিষয়ে কোনো প্রমাণভিত্তিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু স্বীকার করেনি।
মাসদাইর বাজারের সামনে অবস্থিত বেগম রোকেয়া স্কুলের সামনেও মাদক বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সেলিম নামে এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এখানে একটি সক্রিয় স্পট গড়ে উঠেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তারা জানান, স্কুল চলাকালীন সময়েও প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা হয়, যা শিক্ষার্থীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক অভিভাবক এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক অভিভাবক বলেন, আমাদের সন্তানরা স্কুলে যায় পড়াশোনা করতে, কিন্তু সামনে যদি এমন পরিবেশ থাকে, তাহলে তারা কিভাবে নিরাপদ থাকবে?
স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কিশোর-কিশোরীরা সহজেই এই চক্রের শিকার হয়ে পড়তে পারে।
মাসদাইর ঘোসেরবাগ এলাকায় জাহিদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার পাশাপাশি একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
তাদের বিরুদ্ধে হত্যা,চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এমনকি সহিংস ঘটনার অভিযোগও রয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, জাহিদের বাহিনী এতটাই প্রভাবশালী যে, কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জাহিদ প্রশাসনের নজরদারির তালিকায় থাকলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
বাশমুলির শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাজু ও সাজু দুই সহদোরের অত্যাচার অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। প্রশাসনের নাকের ডাগায় প্রকাশ্যে চলছে তাদের মাদক ব্যবসা
ফতুল্লার কাঠের পুল এলাকার আরেক ত্রাশ খালেদ হাসান রবিন ও সোহেল। তারা বিগত সময় ফতুল্লার যুবলীগ নেতা আজমত ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজামের অনুসারী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করে কাঠের পুল এলাকায় গড়ে তুলেছিলো মাদকের বিশাল সম্রাজ্য। হাসিনা সকার পতনের পরে কিছুদিন গাঁ ঢাকা দিলেও বর্তমানে জেলা বিএনপি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির কিছু নেতার ছত্রছায়ায় আবার সেই আগের মাদক সম্রাজ্য গড়ে তুলেছে রবিন ও সোহেল। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিশাল কিশোর গ্যাং যা দ্বারা ফতুল্লা কাঠেরপুল এলাকায় মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করে তারা।
এতসব অভিযোগের পরও প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বা জেলা গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্থানীয়দের উদ্বেগ অস্বীকার করার উপায় নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠলে তা সরাসরি তরুণ প্রজন্মকে বিপথে ঠেলে দেয়। ইতোমধ্যে মাসদাইর ও দেওভোগের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং সক্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে মাদকের প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে এসব স্পট বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা আরও বলেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না—নিয়মিত নজরদারি, কমিউনিটি পুলিশিং এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেও এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, আমাদের পুলিশ সুপার মহোদয় নারায়ণগঞ্জ মাদকের জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে তার লক্ষে আমরা প্রতিনিয়ত মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। এবং আমরা প্রতিনিয়ত মাদক কারবারী ও সেবনকারীদের গ্রেফতার করছি। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা এইসব এলাকাগুলোতে আরও কোঠর অভিযান চালাবো।
আরও পড়ুন: পাগলা-কুতুবপুরে মাদকের ব্যবসায়ি যারা
আরও পড়ুন:ফতুল্লার আলীগঞ্জের মাদক ব্যবসা যাদের নিয়ন্ত্রণে
আরও পড়ুন: ফতুল্লায় মাদকের বিভিন্ন স্পটের নিয়ন্ত্রণে যারা