• মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন |
  • English Version

বাংলা ভাষার পরিচর্যায় আমরা উদাসীন

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন


আমরা ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে ভিনদেশী ভাষাচর্চায় যতটা মনোযোগী, নিজের ভাষাচর্চায় ততটা মনোযোগী নই! মায়ের ভাষাকে মায়ের মতো সহজ-সরল মনে না করে সৎমায়ের মত জটিল-গরল মনে করি। নিজের মা যতই অবুঝ হোক, পাগল হোক, জটিল হোক, কঠিন হোক, তাঁকে বুঝে নেবার জন্য জন্ম থেকেই যতটা আন্তরিক থাকি, সচেষ্ট থাকি, ধৈর্যশীল থাকি; মাতৃভাষা সঠিকভাবে জানার জন্য, বুঝার জন্য, আয়ত্ত করার জন্য, প্রয়োগ করার জন্য, ততটা আন্তরিক থাকি না, সচেষ্ট থাকি না, ধৈর্যশীল থাকি না! তাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলার জটিলতা আমরা অনেকেই কাটিয়ে উঠতে পারি না। এমনকি অনেক লেখাপড়া শিখেও আমরা অনেকেই শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে ও লিখতে পারি না। ভুল ও শুদ্ধ এর পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি না। এর মধ্যে আমি নিজেও একজন।

বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আমরা সবাই কমপক্ষে তিনটি ভাষা কম/বেশি ব্যবহার করে থাকি; বাংলা, ইংরেজি ও ধর্মীয় ভাষা। এর বাইরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষা। এর মধ্যে বাংলা ভাষার চর্চা অন্যান্য ভাষার তুলনায় আমরা অনেকেই কম করে থাকি। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনেক শব্দের বানান ও উচ্চারণ অত্যন্ত জটিল! বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যেগুলোর বানান ও উচ্চারণ ভিন্ন রকম। অনেক ভিন্ন শব্দের উচ্চারণ প্রায় একই রকম। এমন বর্ণ আছে যেগুলোর উচ্চারণ একেক শব্দে একেক রকম। কিছু কিছু শব্দে কিছু কিছু বর্ণের উচ্চারণ উহ্য থাকে।

যেমন: Half, Laugh, Knife, Knee, Tough, Thought, Island, Colonel, Lieutenant, Future, Character… ইত্যাদি অনেক শব্দের বানান আমরা অনেক কষ্ট করে শিখি ও লিখি। প্রতিটি বর্ণের ২টি রূপ (small and capital) বিদ্যমান তাও মনে রাখি। বলি ফুড (Fud), লিখি Food. বলি ব্লাড (Blad), লিখি Blood. বলি আক্তার (Aktar), লিখি Akter. মনে করি, বাড়িকে বাড়ি/বাড়ী একভাবে লিখলেই হয়! কিন্তু হাউজকে Haoj/Hauj/Hawz না লিখে যত্ন করে ঠিক House লিখতে হয় এবং লিখি। আগারগাঁও লেখার সময় চন্দ্রবিন্দু দিতে আমাদের বড়ই অনীহা! অথচ ইংরেজিতে Agargaon লেখার সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটা অতিরিক্ত এন আমরা ঠিকই লিখে থাকি। একজন বাঙালি ডাক্তার হয়ে অনেক রোগের ও ঔষধের জটিল নামের ইংরেজি বানন যত্নসহকারে শুদ্ধ করে লিখতে পারি। কিন্তু যখন বাংলায় লিখি, ‘পানি বেশী খাবেন’ তখন ‘বেশি’ শব্দের বানানটা ভুল লিখি! ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা বিধায় আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শেখার চেষ্টা করি, শিখি, প্রয়োগ করি। তেমনটি বাংলার ক্ষেত্রে করি না!

আবার আমরা যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তারা আরবি ভাষা শিখতে গিয়েও অনেক জটিল বানান ও উচ্চারণ দরদ দিয়ে শিখে থাকি। আরবি প্রায় প্রতিটি বর্ণের ৪টি রূপ বিদ্যমান (মূলরূপ, শব্দের প্রথম রূপ, মাঝের রূপ, শেষের রূপ)। অনেক বর্ণের প্রায় একই রকম বা খুবই কাছাকাছি উচ্চারণ। আরবি আমাদের ধর্মীয় ভাষা বা ইবাদতের ভাষা বিধায় ইহকালের ও পরকালের কল্যাণ চিন্তায় আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সহিহ্ নিয়তে চর্চা করি, শুদ্ধভাবে শেখার চেষ্টা করি। বারবার চেষ্টা করে আয়ত্ত করি, মনে রাখি, প্রয়োগ করি। অনুরূপভাবে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও নিজেদের ধর্মীয় ভাষা আয়ত্ত করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি।

আমরা প্রায় সবাই শুদ্ধভাবে ইংরেজি বা ভিন্ন ভাষা শেখার জন্য যতবার ডিকশনারি দেখি, শুদ্ধভাবে বাংলা শেখার জন্য তার শতভাগের এক ভাগও অভিধান দেখিনা! আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি না, বারবার চর্চা করি না। অন্যান্য ভাষার বিভিন্ন শব্দের বানান যেমন মুখস্থ করি, মনে রাখি; বাংলা ভাষার বানান তেমন মুখস্থ করি না, মনে রাখি না। জটিল মনে করি, জাটিল ঘোষণা করি, কিন্তু জটিলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য মনোযোগী হই না। এটি বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা নয় কি? এমনকি পাঠ্য বই থেকেও শুদ্ধ বানান মনোযোগ দিয়ে আয়ত্ত করি না! যত্রতত্র যেনতেন ভাবে বলি ও লিখি। সাইনবোর্ডে এবং গণমাধ্যমেও ভুল লিখি, ভুল বলি।

ভাষাকে শুদ্ধ রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট না থাকলে, সবাই যার যার মতো বলতে ও লিখতে থাকলে, এক সময় এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে যে, কেউ কারো ভাষা বুঝতে পারবো না! পৃথিবীর সকল ভাষাভাষী নিজের ভাষার পরিচর্যা করেন বলেই তাদের ভাষা বেঁচে থাকে। যারা নিজের ভাষার পরিচর্যা করেন না তাদের ভাষার অস্তিত্ব থাকে না। আমাদের বাংলা ভাষার পরিচর্যার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের আন্তরিক থাকা, সচেষ্ট থাকা আবশ্যক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের ভাষার পন্ডিতগণের ঐকমত্য। বিশেষ করে বিভিন্ন শব্দের বানানের ক্ষেত্রে সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সর্বদা একমত থাকা অত্যন্ত জরুরি।

শুনতে ভালো না লাগলেও একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, বাংলা ভাষাকে আমরা অনেকেই আমাদের লুঙ্গি-গামছার মতই যেকোনোভাবে ব্যবহার করতে পছন্দ করি, ব্যবহার করি! মনে করি, লুঙ্গি-গামছার যেমন কোনো উল্টা-সোজা নেই, বাংলা ভাষারও তেমন কোনো ভুল-শুদ্ধ নেই! যেকোনোভাবে লিখলেই হয়, বললেই হয়! আবার ইংরেজি ভাষাকে প্যান্ট-শার্টের মতই ইস্ত্রি করে, পরিপাটি করে ব্যবহার করতে চাই, করে থাকি। মনে করি, প্যান্ট-শার্টের যেমন উল্টা-সোজা আছে তেমনি ইংরেজি ভাষারও ভুল-শুদ্ধ আছে। অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রেও আমাদের অনুরূপ ভাবনা কাজ করে। শুধু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেই অধিক উদাসীন!

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শব্দে ই-কার বা ঈ-কার প্রয়োগ নিয়েই আমরা এখনও একমত হতে পারিনি, পারছি না! যেমন: ইংরেজি, আরবি, ফারসি, বেকারি, ডিকশনারি, কনফেকশনারি ইত্যাদি বিদেশি শব্দের বানান বাংলা একাডেমির বিধি অনুযায়ী ই-কার হলেও আমরা অনেকেই ইংরাজী, আরবী, ফার্সী, বেকারী, ডিকশনারী, কনফেকশনারী এ ভাবে ঈ-কার দিয়ে লিখি এবং বিভিন্ন যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করি। বাংলা একাডেমির বানান রীতি সবাই অনুসরণ করেন না। বেশকিছু ইসলাম ধর্মীয় লেখক ও প্রকাশক অধিকাংশ শব্দের বানানে ঈ-কার ও ঊ-কার প্রায়োগ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন।

তারা আরবি বা উর্দু উচ্চারণ অনুসারে বাংলায় ব্যবহৃত শব্দের বানান লেখা উচিত বলে মনে করেন। বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব। কেননা, এক ভাষার শব্দের উচ্চারণ/এক্সেন্ট অন্য ভাষার বর্ণ দ্বারা যথাযথভাবে লেখা/প্রকাশ করা যায় না। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বুক বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন হলে একেক সময় একেক ধরনের বানান পাঠ্য বইয়ে প্রয়োগ করে থাকে। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পরিবর্তন হলে রাষ্ট্রীয় ভাষার বানান রীতির কিংবা প্রয়োগের পরিবর্তন হয় এমন দেশ ও জাতি আরও আছে কিনা আমার জানা নেই!

আমরা অনেকেই আবার ভুল বাংলা বলার ও লেখার পক্ষে অবস্থান নিতে, বক্তব্য দিতে লজ্জিত নই! বিশেষ করে অন্যের ভাষা ইংরেজি বলতে ও লিখতে ভুল হলে যতটা লজ্জিত হই নিজের ভাষা বাংলা বলতে ও লিখতে ভুল হলে ততটা লজ্জিত হই না! নিজের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত নই! নিজেকে শুদ্ধ করতে সচেষ্ট নই! কেউ আমাদের ভুল ধরলে আমরা রেগে যাই, হাসিতামশা করি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, তাকে অপমান করি, তার ভুল ধরার চেষ্টা করি! নিজের ভুলকে শুদ্ধ করা গুরুত্বহীন মনে করি। বলে থাকি, বুঝতে পারলেই তো হলো।

এত ভুল শুদ্ধ খুঁজে লাভ কী? আসলে তা ঠিক নয়। ভাষাকে শুদ্ধ রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট না থাকলে, সবাই যার যার মতো বলতে ও লিখতে থাকলে, এক সময় এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে যে, কেউ কারো ভাষা বুঝতে পারবো না! পৃথিবীর সকল ভাষাভাষী নিজের ভাষার পরিচর্যা করেন বলেই তাদের ভাষা বেঁচে থাকে। যারা নিজের ভাষার পরিচর্যা করেন না তাদের ভাষার অস্তিত্ব থাকে না। আমাদের বাংলা ভাষার পরিচর্যার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের আন্তরিক থাকা, সচেষ্ট থাকা আবশ্যক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের ভাষার পন্ডিতগণের ঐকমত্য। বিশেষ করে বিভিন্ন শব্দের বানানের ক্ষেত্রে সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সর্বদা একমত থাকা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, প্রবন্ধিক ও সাহিত্যিক।

এই খবরটি আপনার বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category

Most Viewed Posts