[ad_1]
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলার মাসদাইর পুলিশ লাইন এলাকায় সরকারি খাল দখল করে অবৈধভাবে দোকান নির্মাণ ও বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে জেলা ছাত্রদলের এক সাবেক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত। তার নেতৃত্বে ও প্রভাব খাটিয়ে খাল দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ও আধা-পাকা দোকান, যা বর্তমানে একটি সুসংগঠিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসদাইর পুলিশ লাইন সংলগ্ন খালটি একসময় এলাকার পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য খালটি কার্যকর ভূমিকা রাখত। তবে কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে খালটির বিভিন্ন অংশ ভরাট করা হয়। প্রথমে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট শুরু হলেও পরে পরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলে খালটি সংকুচিত করা হয়। এরপর দখলকৃত অংশে টিনশেড, কাঠামো ও আধা-পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়।
বর্তমানে সেখানে সারি সারি দোকান দেখা যায়, যেখানে মুদি দোকান, চায়ের দোকান, মোবাইল সার্ভিসিং আইটেমসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, পুরো বিষয়টি একটি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াসিন আরাফাত।
অভিযোগ রয়েছে, এই দোকান বাণিজ্য সরাসরি ইয়াসিন আরাফাত নিয়ন্ত্রণ না করলেও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ফতুল্লা থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হৃদয় মাদবর মাঠপর্যায়ে সবকিছু দেখভাল করছেন। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ, দোকান বরাদ্দ দেওয়া, ভাড়া নির্ধারণসহ সব কার্যক্রম তার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাল দখল করে দোকান নির্মাণের সময় প্রতিটি দোকানের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘সিকিউরিটি মানি’ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের ভাড়া দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে দোকান পাওয়া তো দূরের কথা, সেখানে ব্যবসা পরিচালনাও সম্ভব নয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে দোকান নিয়েছি। এখানে ব্যবসা করতে হলে তাদের নিয়ম মেনে চলতেই হবে। কোনো ধরনের অভিযোগ করার সাহস নেই, কারণ তারা প্রভাবশালী।
আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রথমে বলা হয়েছিল সাময়িকভাবে দোকান বসানো যাবে। কিন্তু এখন এটি স্থায়ী আকার ধারণ করেছে। নিয়মিত ভাড়া দিতে হচ্ছে, না দিলে দোকান ছেড়ে দিতে বলা হয়।
এদিকে খাল দখলের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আগে বৃষ্টি হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যেত। এখন একদিন বৃষ্টি হলে তিন-চার দিন পানি জমে থাকে। খাল দখল করার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
আরেকজন বলেন, আমরা অনেকবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে মনে হচ্ছে প্রভাবশালীদের কারণেই প্রশাসন নীরব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর এলাকায় খাল দখল ও ভরাটের ফলে শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, পরিবেশের উপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইয়াসিন আরাফাতের মুঠো ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই জায়গাটি আসলে খাল নয়, এটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। স্থানীয়দের সুবিধার জন্য দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশফাকুর রহমান সরকারি খাল দখল করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে, আমরা খতিয়ে দেখছি।
তিনি আরও জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় এ ধরনের অবৈধ দখল বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে। ফলে একদিকে সরকারি সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
তাদের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কাজ করার সাহস না পায়।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত তদন্ত করে খালটি পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং অবৈধভাবে নির্মিত দোকানপাট উচ্ছেদ করতে হবে। পাশাপাশি যারা এই দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে কী উদ্যোগ গ্রহণ করে।
[ad_2]