[ad_1]
কিডনির পাথর (Kidney Stones) কী?
কিডনির পাথর হলো প্রস্রাবে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, খনিজ ও লবণের শক্ত জমাট বাধা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা, যা কিডনির ভেতরে বা ইউরেটারে (মুত্রনালিতে) তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে রেনাল ক্যালকুলাস (Renal calculus) বা রেনাল ক্যালকিউলাই (Renal calculi) বলে; পাথরের সংখ্যা একটি হলে ”রেনাল ক্যালকুলাস” আর একাধিক হলে ”রেনাল ক্যালকিউলাই” বলে।
আমাদের কিডনি রক্ত পরিষ্কার করে শরীরের বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু যখন প্রস্রাবে কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং একই সঙ্গে পানি কম থাকে, তখন সেই উপাদানগুলো একে অপরের সঙ্গে জমে গিয়ে ধীরে ধীরে পাথরের মতো শক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়—যাকে আমরা কিডনির পাথর বা কিডনী স্টোন বলি।
আমাদের শরীরে এমন কিছু উপাদান আছে, যেগুলোর পরিমাণ প্রস্রাবে বেড়ে গেলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। বিশেষ করে প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড বা অক্সালেট বেশি থাকলে কিডনিতে পাথর তৈরির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
প্রাথমিক অবস্থায় কিডনির পাথর অনেক সময় কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না। তবে পাথরটি যদি ইউরেটার বা মূত্রনালিতে আটকে যায়, তখন তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, বমি ও বমি ভাব, এমনকি প্রস্রাবে রক্ত যাওয়ার মত গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাথর সাধারণত কিডনিতে তৈরি হয়ে প্রস্রাবের নালি ও মূত্রথলিতে নেমে আসে।
কিডনি পাথরের অন্য নাম:
কিডনি পাথরকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন—
১) রেনাল ক্যালকুলাস (Renal calculus)
২) নেফ্রোলিথ (Nephrolith)
৩) নেফ্রোলিথিয়াসিস (Nephrolithiasis)
৪) ইউরোলিথিয়াসিস (Urolithiasis)
৫) ইউরিনারি স্টোন (Urinary stones)
সহজ কথায়, কিডনিতে বা প্রস্রাবের পথে জমে যাওয়া শক্ত কণাকেই কিডনির পাথর বা কিডনি স্টোন বলা হয়।
কিডনিতে পাথর কেন হয়?
কিডনির পাথরের সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো ডিহাইড্রেশন (Dehydration), অর্থাৎ পর্যাপ্ত পানি পান না করা। যারা গরম আবহাওয়ায় কাজ করেন, বেশি ঘামেন কিন্তু পানি কম পান করেন, তাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি থাকে। তাই মরুভূমিতে, মধ্যপ্রাচ্যের গরম দেশগুলোতে, এমনকি আমাদের এই উপমহাদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচুর কিডনি পাথরের রোগী দেখা যায়। এছাড়া কিছু খাদ্যাভ্যাস, ওজন, রোগ, ওষুধ বা সাপ্লিমেন্টও পাথর তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
চলুন সহজেই জেনে নিই কিডনী পাথরের প্রধান প্রধান আরো কিছু কারণ-
১) শরীরে পানি কমে গেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায়, ফলে খনিজ ও লবণ জমে পাথর তৈরি হয়।
২) বারবার প্রস্রাবে সংক্রমণ (UTI) হলে কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে।
৩) শরীরে এমন কিছু খনিজ ও প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, যা কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করে। এসব উপাদানকে বলা হয় ‘ইউরিনারি স্টোন ইনহিবিটরস্’ (Urinary Stone Inhibitors)। এসব ইনহিবিটরের পরিমাণ কমে গেলে বা কার্যকারিতা হ্রাস পেলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৪) প্রস্রাবে সাইট্রেট কমে গেলে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৫) প্রস্রাবে ম্যাগনেশিয়াম কম থাকলেও পাথর তৈরি সহজ হয়।
৬) প্রস্রাবে জিংকের পরিমাণ কমে গেলে পাথর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
৭) মানব শরীরে এমন কিছু উপাদান আছে, যেগুলোর পরিমাণ প্রস্রাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় বেড়ে গেলে তখন সেগুলো জমে গিয়ে ধীরে ধীরে কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে। যেমন—
প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম বেশি বের হলে ক্যালসিয়াম অক্সালেট বা ক্যালসিয়াম ফসফেট পাথর হয়।
প্রস্রাবে ইউরিক অ্যাসিড বেশি নির্গত হলে ইউরিক অ্যাসিড স্টোন তৈরি হয়।
প্রস্রাবে অক্সালেট বেশি থাকলেও পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৮) যে কোন কারণে মূত্রপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পাথর তৈরি হতে পারে।
৯) মূত্রতন্ত্রের জন্মগত ত্রুটি থাকলেও কিডনিতে পাথর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১০) কিছু মেটাবলিক রোগের কারণে কিডনি স্টোন হয়। যেমন- প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হলে বা টিউমার হলে রক্ত ও প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম বেড়ে যায়। এই অবস্থায় অনেক সময় দুই কিডনিতেই একাধিক পাথর তৈরি হতে পারে।
১১) শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মগত মেটাবলিক সমস্যা, যেমন- সিসটিনিউরিয়া এবং জ্যানথিনিউরিয়া কিডনি স্টোনের কারণ হতে পারে।
১২) সবচেয়ে বেশি যে উপাদানগুলো থেকে পাথর হয়, সেগুলো হলো ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড, সিস্টিন, ফস্ফেট। এই উপাদানগুলো মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে কিডনীতে পাথর হয়।
১৩) বেশি সোডিয়াম, লবণ, চিনি, মাংস বা সামুদ্রিক খাবার খেলে কিডনীতে পাথর হতে পারে।
১৪) জেনেটিক বা বংশগত কারণে কিডনীতে পাথর হতে পারে।
১৫) কিছু রোগ, যেমন- ডায়াবেটিস, গাউট, হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম, ইউটিআই প্রভৃতি রোগের কারণে কিডনীতে পাথর হতে পারে।
১৬) ভিটামিন সি ও ডি অতিরিক্ত গ্রহণের কারণে কিডনীতে পাথর হতে পারে।
১৭) কম ফলমূল ও শাকসবজি, কম ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার ও কম পানি পান করলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
১৮) কিছু নির্দিষ্ট রোগ ও শারীরিক অবস্থায় কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। যেমন— ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারি, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ,গাউট, বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ, খাওয়াদাওয়া সংক্রান্ত মানসিক রোগ প্রভৃতি রোগের কারণে কিডন পাথরের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কিডনির পাথরের ধরণ:
কিডনির সব পাথর এক ধরনের নয়। পাথরের রাসায়নিক গঠন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কিডনির পাথর পাওয়া যায়।
চলুন সহজেই জেনে নিই কিডনির পাথরের ধরন-
১) ক্যালসিয়াম স্টোন (সব চেয়ে বেশি হয়)
মোট কিডনি পাথর রোগীর প্রায় ৬০–৮০% ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম স্টোন দেখা যায়। এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরনের কিডনি পাথর।
ক্যালসিয়াম স্টোন প্রধানত দুই ধরনের, যথা-
ক) ক্যালসিয়াম অক্সালেট স্টোন
সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। প্রস্রাবে অক্সালেট ও ক্যালসিয়াম বেশি হলে এই পাথর তৈরি হয়।
খ) ক্যালসিয়াম ফস্ফেট স্টোন
তুলনামূলকভাবে কম হলেও উল্লেখযোগ্য। সাধারণত প্রস্রাব ক্ষারীয় (alkaline) হলে বা কিছু মেটাবলিক সমস্যায় (যেমন প্যারাথাইরয়েড সমস্যা) এটি তৈরি হতে পারে।
এই ধরনের কিডনী পাথর এক্স-রে করলে সাধারণত ধরা পড়ে।
২) মিক্সড স্টোন
ক্যালসিয়াম অক্সালেট ও ক্যালসিয়াম ফসফেট উভয়ের সংমিশ্রণে যে কিডনি পাথর তৈরি হয়, তাকে ‘মিক্সড স্টোন’ (Mixed Stone) বলা হয়।
৩) স্ট্রুভাইট স্টোন (Struvite Stone)
এই স্টোন তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ট্রিপল ফসফেট, যেমন- অ্যামোনিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়াম ফসফেট একত্রে মিলে যে স্টোন তৈরি হয় তাকে স্ট্রুভাইট স্টোন বলে। সাধারণত এই স্টোন বারবার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট (UTI) ইনফেকশন হলে হয়, প্রস্রাব ক্ষারীয় (Alkaline) হলে বেশি তৈরি হয়।
৪) ইউরিক অ্যাসিড স্টোন
সাধারণত এক্স-রেতে দেখা যায় না। গাউট, ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত প্রাণী-প্রোটিনযুক্ত খাবার খেলে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রস্রাব সাধারণত অম্লীয় (Acidic) হলে ইউরিক অ্যাসিড স্টোনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৫) সিস্টিন স্টোন (Cystine Stone)
খুবই বিরল ধরনের কিডনি পাথর। প্রধানত জন্মগত রোগ সিস্টিনিউরিয়া (Cystinuria) এর কারণে তৈরি হয়। কারণ কিডনির টিউবিউলে সিস্টিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড ঠিকমতো শোষিত না হওয়ায় প্রস্রাবে অতিরিক্ত সিস্টিন দেখা যায়, আর এই সিস্টিন জমে পাথর তৈরি হয়।
কিডনি স্টোনের লক্ষণ ও সতর্কতা:
অনেক সময় কিডনিতে পাথর থাকলেও রোগী কোনো ধরনের উপসর্গ অনুভব করেন না। বিশেষ করে ছোট আকারের পাথর দীর্ঘদিন নীরবে থাকতে পারে এবং রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় হঠাৎ ধরা পড়ে। তবে পাথর নড়াচড়া করলে বা প্রস্রাবের নালিতে আটকে গেলে সমস্যাটি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে ?
কিডনির পাথর নড়াচড়া করলে সাধারণত পিঠ বা কোমরের এক বা দুই পাশে পাঁজরের নিচে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথা ধীরে ধীরে তলপেট, যৌনাঙ্গ বা কুঁচকির দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ঢেউয়ের মতো ব্যথা হয়; ব্যথা কখনো কম, কখনো হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। এছাড়াও প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, প্রস্রাব লাল বা গোলাপি রঙের হওয়া, প্রস্রাব ঘোলা বা দুর্গন্ধযুক্ত হওয়াও কিডনি স্টোনের লক্ষণ হতে পারে। ব্যথার সঙ্গে বমি বা বমিভাব দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
লক্ষণহীন কিডনি স্টোন-
ছোট আকারের কিডনি স্টোন অনেক ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। মেরুদণ্ড বা কোমর ব্যথার জন্য করা নিয়মিত পরীক্ষা বা আল্ট্রাসনোগ্রামের সময় হঠাৎ করেই এ ধরনের পাথর ধরা পড়ে।
পাথরের আকার বড় হলে যে সব উপসর্গ দেখা দেয়:
পাথরের আকার বড় হলে উপসর্গ আরও তীব্র হয়। সহ্যহীন কোমর বা পেটব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া, জ্বর ও কাঁপুনি দেখা দিতে পারে। পাথর প্রস্রাবের নালি আঁচড়ালে বা আংশিকভাবে বন্ধ করে দিলে ব্যথা আরো তীব্র হয়। পাথর যত এগোয়, ব্যথার স্থান ও তীব্রতাও তত পরিবর্তিত হতে থাকে।
কিডনী পাথরের জটিলতা ও জরুরি সতর্কতা এবং করণীয়:
পাথর যদি ইউরেটারে আটকে যায়, তবে কিডনি ফুলে যেতে পারে। সংক্রমণ যুক্ত হলে জ্বর, কাঁপুনি ও তীব্র ব্যথার সঙ্গে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরোসেপসিস নামক গুরুতর সংক্রমণ সৃষ্টি হয়ে জীবনঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব এবং কিডনি সুস্থ রাখা যায়।
কিডনি পাথরের পরীক্ষা, পাথর নির্ণয় ও হোমিও চিকিৎসা:
কিডনি পাথর সময়মতো শনাক্ত হলে ও সঠিক চিকিৎসা করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা না হলে এই পাথর কিডনির মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পাথর শনাক্ত ও চিকিৎসা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
কীভাবে পাথর শনাক্ত করা হয়?
রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ, শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা, এক্স-রে বা আলট্রাসনোগ্রাম, প্রয়োজনে ইমেজিং বা সিটি স্ক্যান করে কিডনীর স্টোন নির্ণয় করা হয়।
প্রস্রাব পরীক্ষা করলে লোহিত কণিকা (রক্ত), পাস সেল এবং পাথরের ক্রিস্টাল পাওয়া যেতে পারে।
রক্ত পরীক্ষায় ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা জানা যায়, যা পাথর তৈরির কারণ বুঝতে সাহায্য করে।
বারবার পাথর হলে ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাব সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।
ইমেজিং পরীক্ষার ভূমিকা:
পেটের KUB এক্স-রে করলে প্রায় ৯০ শতাংশ কিডনি পাথর ধরা পড়ে। আলট্রাসনোগ্রাম কিডনি ও মূত্রথলির পাথর শনাক্তে কার্যকর। তবে খুব ছোট পাথর বা মূত্রনালির পাথর নির্ণয়ে সিটি স্ক্যান সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। বিশেষ ক্ষেত্রে IVP বা রেট্রোগ্রেড পাইলোগ্রাম করা হয়।
কিডনি পাথরের হোমিও চিকিৎসা ও ওষুধ:
হোমিওপ্যাথিতে কিডনি পাথরের চিকিৎসা রোগীর উপসর্গ, পাথরের ধরন, ব্যথার প্রকৃতি ও শারীরিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। রোগী সামগ্রিক উপসর্গের উপর ভিত্তি করে সঠিক ওষুধ নির্বাচন ও কার্যকরী ডোজ প্রয়োগ করতে পারলে আর রোগী নিয়মমাফিক ওষুধ সেবণ করলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ছোট ও মাঝারি আকারের পাথর ধীরে ধীরে গলে বা ভেঙে প্রস্রাবের সঙ্গে বের হতে সাহায্য করে, তীব্র ব্যথা কমায়, প্রস্রাবের জ্বালা ও বাধা দূর করে,পুনরায় পাথর হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করে। পাথর অনেক বড় হয়ে গেলে, কিডনি ফুলে গেলে ও তার কার্যকারিতা দ্রুত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে এবং রোগীর জীবনাশঙ্কা তৈরি হলে দ্রুত আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে পাথর অপসারণ করা খুবই জরুরি। পাথর অপসারণের পরবর্তী কোন জটিলতা থাকলে বা ভবিষ্যতে পুনরায় পাথর হওয়ার প্রবণতা কমাতে হোমিও চিকিৎসা অনেকাংশেই উপকারী।
কিডনি পাথরে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হোমিও ওষুধ:
বারবেরিস ভালগারিস, লাইকোপোডিয়াম, ক্যান্থারিস, সার্সাপারিলা, হাইড্রেঞ্জিয়া, প্যারেইরা ব্রাভা, সলিডাগো প্রভৃতি ওষুধ কিডনী পাথরে অত্যন্ত কার্যকারী। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী নির্বাচিত সঠিক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ মত নিয়মিত সেবণ করলে দ্রুত উপকার দর্শে।
হোমিও চিকিৎসায় সতর্কতা:
সব রোগীর জন্য একই ওষুধ প্রযোজ্য নয়। বড় পাথর, তীব্র সংক্রমণ বা কিডনি কাজ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকলে আগে পরীক্ষা জরুরি। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
কিডনির পাথর প্রতিরোধের উপায়
কিডনির পাথর (Renal stone) একবার হলে ভবিষ্যতে আবার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অনুসরণ করলে কিডনির পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। চলুন খুব সহজেই জেনে নিই কিডনির পাথর প্রতিরোধের উপায় ও কার্যকর পরামর্শ—
১) পর্যাপ্ত পানি পান:
কিডনির পাথর প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। শরীরে পানির ঘাটতি হলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং পাথর তৈরির উপাদানগুলো জমাট বাঁধতে পারে। সাধারণত প্রতিদিন ২–৪ লিটার পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে এটি ব্যক্তির কাজের ধরন, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে পানির প্রয়োজনীয়তা কম-বেশি হতে পারে। গরম বা আর্দ্র পরিবেশে এবং বেশি পরিশ্রম করলে বেশি পানি প্রয়োজন, আর শারীরিক অসুস্থতা বা কিডনি সমস্যা থাকলে পানির পরিমাণ সীমিত রাখা যেতে পারে। তাই পানি পানও সেই অনুযায়ী সমন্বয় করা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান করলে কিডনিতে চাপ কম থাকে, পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং শরীর হাইড্রেটেড থাকে। সর্বদা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি পান করুন।
লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২ লিটার প্রস্রাব হয় এবং প্রস্রাবের রঙ স্বচ্ছ বা হালকা থাকে।
২) লবণ নিয়ন্ত্রণ:
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়ায়, যা পাথর তৈরির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তাই খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমানো জরুরি।
৩) পাথরের ধরন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা:
পাথরের ধরন অনুযায়ী খাদ্য নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিডনির পাথরের রাসায়নিক গঠন ভেদে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে-
যদি ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হয় তা হলে অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবার, যেমন- পালংশাক, বাদাম, ঢেঁড়স , চকলেট, কিউই, স্ট্রবেরি ইত্যাদি কম খেতে হবে। আর যদি ইউরিক অ্যাসিড পাথর হয় তা হলে লাল মাংস ও উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাদ্য কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রস্রাবে সাইট্রেট কম থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পটাশিয়াম সাইট্রেট বৃদ্ধির খাবার খেতে হবে। অজ্ঞাত কারণে প্রস্রাবে ক্যালসিয়াম বেড়ে গেলে মূত্রবর্ধক খাবার খেতেহবে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৪) সংক্রমণ ও অন্যান্য কারণের চিকিৎসা:
মূত্রনালিতে সংক্রমণ বা প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা থাকলে তা দ্রুত চিকিৎসা করা উচিত। কারণ এটি পাথর তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়াও মেটাবলিক সমস্যা, যেমন- প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত কার্যকারিতা থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
৫) ভিটামিন গ্রহণে সতর্কতা:
অতিরিক্ত ভিটামিন সি শরীরে অক্সালেটে রূপান্তরিত হতে পারে এবং অতিরিক্ত ভিটামিন ডি ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ভিটামিন ও চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। তবে স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শরীরের জন্য উপকারী।
৬) প্রস্রাব চেপে ধরে না রাখা:
প্রস্রাব চেপে ধরে রাখা উচিত নয়। সময়মতো প্রস্রাব করার চেষ্টা করুন, এতে কিডনিতে চাপ কমে এবং পাথর বা সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
৭) নিয়মিত পরীক্ষা ও ফলোআপ:
যাঁদের একবার কিডনির পাথর হয়েছে, তাঁদের নিয়মিত রক্ত ও মূত্র পরীক্ষা করা উচিত। পাথর বের হলে তার রাসায়নিক বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নির্ধারণ সহজ হয়।
কিডনির পাথর প্রতিরোধে সর্বশেষ পরামর্শ হলো সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অপরিহার্য। ব্যক্তিভিত্তিক ঝুঁকি নির্ধারণ ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে এ রোগের পুনরাবৃত্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কখন ডাক্তার দেখানো খুব জরুরি:
যখন ব্যথা তীব্র হয়; সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, এমন বসে বা শুয়েও আরাম পাওয়া যায় না, ব্যথার সঙ্গে বমি বা বমিভাব, ব্যথার সঙ্গে জ্বর ও কাঁপুনি, প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাব করতে কষ্ট হয় বা বন্ধ হয়ে যায়, এমন কষ্টকর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরার্শ নিবেন।
বারবার কিডনি স্টোন হলে কী করবেন?
যাঁদের একাধিকবার কিডনি স্টোন হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে— খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান, অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবার কম খাবেন এবং চিকৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
পরিশেষে মনে রাখবেন, কিডনি স্টোন পুনরাবৃত্তি রোধ করতে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত চেকআপ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন, কিডনীর সুরক্ষা নিশ্চিত করুন, সুস্থ থাকুন।
লেখক:
ডা. গাজী খায়রুজ্জামান
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট।
মোবাইল: ০১৭৪৩৮৩৪৮১৬

[ad_2]