
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) গভীর নলকূপের রেজিস্ট্রেশন ও পানির কর আরোপের সিদ্ধান্ত ঘিরে নগরজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনা, নাগরিক আন্দোলন ও আইনি প্রশ্নের মুখে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
নাসিক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সিটি করপোরেশন ঘোষণা দেয় যে নগরীর আবাসিক ও বাণিজ্যিক গভীর নলকূপগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হবে এবং এর বিপরীতে পানির কর দিতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২৭টি ওয়ার্ডে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। মাইকিং করে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘোষণা দেওয়া হয়, নির্ধারিত সময়ের পর রেজিস্ট্রেশন করলে ১০ থেকে ১৫ বছরের বকেয়া জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘোষণার পর থেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন গভীর নলকূপ ব্যবহারকারী বাসিন্দারা। তারা অভিযোগ করেন, নাসিক নিজস্ব পানির সরবরাহ ব্যবস্থায় মানসম্মত ও নিয়মিত পানি দিতে ব্যর্থ হলেও উল্টো নাগরিকদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গত ১৮ মে। সেদিন সকালে নারায়ণগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে “গভীর নলকূপ ব্যবহারকারী আবাসিক সমবায় সমিতি”-র উদ্যোগে এক নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক নেতারা অংশ নিয়ে নাসিকের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে পানি সংকট, জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্ভোগে ভুগছে। এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে নতুন কর আরোপ জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত।
গভীর নলকূপ ব্যবহারকারী আবাসিক সমবায় সমিতির সদস্য মোহাম্মদ রমজান নূর রশিদ প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকে উদ্দেশ করে বলেন,
“সামনে নির্বাচন, সাখাওয়াত সাহেব ইলেকশন করবেন না? খবর আছে আপনার।”
সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন,
“আপনি নির্বাচিত নন, নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক। আগে নাগরিকদের ভালো পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন, তারপর ট্যাক্সের কথা বলুন।”
সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল অভিযোগ করেন, নাসিক নাগরিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। তিনি বলেন,
“৩০ এপ্রিলের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন না করলে ১০ থেকে ১৫ বছরের জরিমানার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তার দাবি, বাংলাদেশ ওয়াসা পূর্বে গভীর নলকূপের ওপর যে কর আরোপ করেছিল, তা হাইকোর্ট স্থগিত করেছিলেন। সেই মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নতুন করে একই ধরনের সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে কতটা বৈধ—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সমাবেশ থেকে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত গভীর নলকূপের ওপর কর ও রেজিস্ট্রেশনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার না করলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
নাগরিক সমাবেশের পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আন্দোলন সংগঠিত করা হচ্ছে। তবে আন্দোলনের মাত্রা বাড়তে থাকায় মাত্র চার দিনের মাথায় অবস্থান বদল করেন তিনি। পরে ঘোষণা দেওয়া হয়, গভীর নলকূপের জন্য আপাতত কোনো রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে গভীর নলকূপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের একাংশ মনে করছেন, সম্ভাব্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখেই প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান আপাতত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। ভবিষ্যতে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বে এলে একই সিদ্ধান্ত আবারও কার্যকর করার চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
এদিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন না করে কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়াটাই ছিল নাসিকের বড় ভুল। কারণ, অনেক এলাকাতেই মানুষ নিয়মিত নিরাপদ পানি না পেয়ে নিজ খরচে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন।
উল্লেখ্য, এর আগে নাসিকের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সময়েও গভীর নলকূপের রেজিস্ট্রেশন ফি ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে নাগরিকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসতে হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিটি করপোরেশনের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত “বুমেরাং” হয়ে দাঁড়িয়েছে নাসিক প্রশাসকের জন্য।