
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, কিছুদিন আগে এক সাংবাদিক ছোট ভাই মারফত আমি খবর পাই পতিত শক্তির প্রতি অনুগত একটা গ্রুপ বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে চোথা সরবরাহ করেছে। এই গ্রুপে কারা কারা আছেন তাদের নামও জানি। তাদের নাম-পরিচয় আর নাই বা বললাম আজকে। তো চোথা সরবরাহ করে বলা হয়েছে আমাকে নিয়ে রিপোর্ট করতে। মূলত রিপোর্ট না, ফ্রেমিং করা আসলে। এর মধ্যে আছে জুলাই যাদুঘর থেকে ১১০ কোটি টাকা লোপাট, ১১০০০ কোটি টাকা পাচার। নিজেই নিজেকে জুলাই যাদুঘরের সভাপতি ঘোষণা করেছেন ফারুকী। তারেক রহমানের সাথে দেখা করতে চেষ্টা করছেন ফারুকী। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে দশ বছর ব্যাপী অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছে ফারুকী। মানে এখন আর সংবাদ তৈরি করতে কোনো তথ্য প্রমাণ লাগে না। জাস্ট চালায় দাও।
এই যেমন গতকাল একটা রিপোর্টে বলা হলো ফারুকী বেনামী প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দিয়েছেন। অথচ এই অনুদান সুপারিশ করে মহানগর বাছাই কমিটি। সেখান থেকে যায় জাতীয় কমিটিতে। যেখানে আমার কোনো ভূমিকাই নাই। কমিটি সুপারিশ চুড়ান্ত করে সচিবের বরাবর ফাইল পাঠায়। সচিব স্বাক্ষর করে মন্ত্রীকে পাঠায়। মন্ত্রী জাস্ট অনুমোদন দেন। মন্ত্রীর পক্ষে আসলে কি বাস্তবে সম্ভব বাড়ী বাড়ী তদন্ত করা? এটা নির্ধারণ করার জন্যই তো বাছাই কমিটি। অথচ মজার ব্যাপার দেখেন বাছাই কমিটির কারো ইন্টারভিউ নাই ওখানে ???? তারপরেও কথা থাকে বাছাই কমিটি কি ভুল করতে পারে না? পারে। তখন নিয়ম হলো তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আরেক রিপোর্টে টিআইবির সভাপতি আমার শ্রদ্ধেয় ইফতেখার ভাই বলেছেন জুলাই যাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদে নিজেই নিজেকে সভাপতি করে আমি ঠিক কাজ করিনি। অথচ উনি খোঁজ নিলেই জানতেন অনেক বোর্ডেই মন্ত্রী পদাধিকার বলে সভাপতি। শিল্পকলা একাডেমি, শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট সহ আরো অনেক জায়গায় এরকম আছে। অন্যান্য অনেক বোর্ডেই একইরকম বিধান আছে। তবে জুলাই যাদুঘরের ক্ষেত্রে আমি পদাধিকার বলে সভাপতি নই। এই জাদুঘরের কিউরিটরিয়াল ডিরেক্টর এবং প্ল্যানিং চিফ হিসাবেও আমি একটা বাড়তি দায়িত্ব পালন করেছি, বিনা পারিশ্রমিকে। আমাদের মেয়াদ শেষ হয়ে আসার সময় আমরা বোর্ড তৈরির ধাপে পৌঁছাই। তখন প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শে এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ঠিক হয় আমাকে সভাপতি হিসাবে থাকতে হবে যাদুঘর চালু হওয়া পর্যন্ত। যাতে কাজটা স্মুথলি শেষ হয়। যে কারনেই আমি এখনো সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। নতুন সরকার আসার পর দায়িত্ববানদের বলি দ্রুত যাদুঘর উদ্বোধন করে আমাকে ছুটি দেয়ার জন্য।
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে ১১০ টাকার টেন্ডার লোপাট। লোপাট হইলে কাজটা করলো কে? দ্বিতীয়ত ঐ টেন্ডার আমার মন্ত্রণালয়েরই না। ঐটা পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাজ। তারপর বলা হলো- ডিপিএম পদ্ধতিতে ডকুমেন্টারি বানানোর কাজ দেয়া হয়েছে এক প্রতিষ্ঠানকে। জুলাই পূনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালার মাত্র বিশ দিন সময় হাতে ছিলো বলেই বিশেষ বিবেচনায় যথাযথ বিধি অনুসরণ করে ডিপিএম মেথডে কাজগুলো দেয়া হয়েছে এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ তরুন ফিল্মমেকারদের। তাদের বানানো বেশিরভাগ ছবিই চীফ অ্যাডভাইজার পেইজে রিলিজ হয়েছে। সামনে সেগুলো জুলাই যাদুঘরে নিয়মিত দেখানো হবে।
ইউ ফেইলড টু কিল আবরার ফাহাদ, পিলখানাঃ ৩৬ আওয়ারস অব বিট্রেয়াল, আয়নাঘর ফাইলসঃ সালাহউদ্দিন আহমেদ, আয়নাঘর ফাইলসঃ সাজেদুল ইসলাম সুমন, আয়নাঘর ফাইলসঃ আরমান, ট্রায়াল অব জুলাই ম্যাসাকার সহ আরো বেশ কিছু আছে ডকুমেন্টারি তৈরি করেছি আমরা। আমাদের করা এই সব ডকুমেন্টারি এবং অন্যান্য কনটেন্টের অডিয়েন্স রেসপন্স অবিশ্বাস্য। সরকারি কাজ সাধারণত কেউ দেখে না। আমাদের মন্ত্রণালয়ের করা কাজের ভিউ শুধু চীফ অ্যাডভাইজার পেজেই ১০০ মিলিয়নের উপরে। আজ থেকে বহু বছর পরে যখন আমরা কেউ থাকবো না এই দুনিয়ায় তখন এই ডকুমেন্টারিগুলোই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন ডকু ও টিভিসি বানিয়েছেন অনম বিশ্বাস, কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, মাহাথির স্পন্দন, রাকা নোশিন, সাদিয়া রোজা, মাহমুদুল ইসলাম আদনান, নাজমুল নবীনের মতো পাওয়ারফুল তরুন ফিল্মমেকাররা। মনে রাখতে হবে আমাদের বিভাজনের ক্ষত এতোই গভীর যে সকল ফিল্মমেকারই যে জুলাই নিয়ে কাজ করবেন এমন না। আবার এমন একজন ভেন্ডরকেই আমার কাজটা দিতে হবে যিনি এই ফিল্মমেকারদের ডিল করতে পারবেন এবং ক্যাশ ফ্লো ঠিক রাখতে পারবেন যাতে মাঝপথে কাজ আটকে না যায়। এখানেও মনে রাখবেন সব ভেন্ডরই যে জুলাই নিয়ে কাজে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ছিলো তখন তাও না। নানারকম ভয়ভীতি আমি দেখেছি। তো শেষ পর্যন্ত যে আমরা ঠিক ভেন্ডরকে বেছে নিয়েছিলাম এটা তো ফলাফলেই প্রমাণিত।
আরেকটা অভিযোগ। নিয়োগে অনিয়ম। প্রথমত এখনও কোনো নিয়োগ হয়ই নাই। এবার আসি নিয়োগের যে বিশেষ বিধান রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিয়েছেন এবং যেটা নিয়ে কোথাও কোথাও বিতর্ক তোলার চেষ্টা করা হয়েছে সেটা নিয়ে কথা বলি। জুলাই যাদুঘর অধ্যাদেশে একটা বিশেষ বিধান আছেঃ বিশেষায়িত যাদুঘর বিধায় বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীর ক্ষেত্রে নিয়োগের যে কোনো বিধান কর্তৃপক্ষ শিথিল করতে পারবে। দুইটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে কেনো এই সেফগার্ড রাখা।
উদাহরণ ১ঃ ধরা যাক, জুলাইতে চোখ হারানো মাহবুবের কথা। তাকে যদি আমরা মিউজিয়ামে আহতদের সেকশনে নিয়োগ দিতে চাই, কিভাবে দিবো? তার তো সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা নাই। কিন্তু ঐ সেকশনের জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা লোকের চেয়েও মাহবুব বেশী যোগ্য। তাহলে? আরেকটা উদাহরণ দেইঃ বাহাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর করা হলে যে লোক স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে তাকে আপনি ঐ যাদুঘরে চাকরী দিতেন? দিতেন না। সেই একই কারনে জুলাই যাদুঘরে জুলাই বিরোধী কারো চাকরী হতে পারে না। তাহলে কর্তৃপক্ষের হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকলে তারা কিভাবে এই প্রতিষ্ঠান রক্ষা করবে? এটা তো একটা বিশেষ মিউজিয়াম। এটার বিশেষ সুরক্ষাও দরকার। প্রসঙ্গত আপনাদের জানাই- এই মিউজিয়ামের উপর আক্রমণের চেষ্টা ইতিমধ্যেই হয়েছে। অন্তত দুইবার। প্রথম বার ডাস্টবিনে সাউন্ড গ্রেনেড রেখে গিয়েছে। দ্বিতীয় বার, জুলাইয়ে ছাত্রদের উপর হামলার আসামি এক ছাত্রলীগ কর্মী ক্লিনার সেজে মিউজিয়ামে ঢুকে পড়ে। ঢুকে বড় পরিকল্পনা করা নিয়ে গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে আলাপ আলোচনা করে। এক পর্যায়ে ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়। ফলে এই মিউজিয়ামে কাকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে এটা এক বিশাল কনসার্ন।
শেষ করছি এটা বলে, আমি জানি আমি অনেক বড় পাপ করেছি হাসিনার অপকর্ম নিয়ে ডকুমেন্টারি সিরিজ এবং জুলাই যাদুঘর করার মাধ্যমে। এর বাইরেও আরো অনেককে বিব্রত করেছি স্ট্যাটাস কো-কে নাড়া দিয়ে। বাট দ্যাটস ফাইন। আমি জুলাই শহীদ, গুম-খুনের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। একাত্তরের শহীদদের নিয়ে স্পার্টাকাস ৭১ বানাতে আমি যে আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়েছি, সেই একই আবেগে আমি জুলাই শহীদ এবং ১৬ বছরে নিপীড়িত মানুষের ভয়েস ইতিহাসের বুকে খোদাই করতে চাইছি। ইটস আ ডেলিবারেট চয়েজ। আমার আসলে এখানে কিছু করার নাই। রিপোর্ট হচ্ছে, হোক। আমি থাকবো জুলাইয়েরই লোক, একাত্তরের লোক, কৃষক প্রজা পার্টির লোক। কিন্তু যতো কিছুই চলুক, জুলাই মিউজিয়াম চালু হবেই। দ্রুতই।
ফুটনোটঃ এর পর থেকে এইসব বিষয়ে আর কোনো উত্তর দিতে যাবো না আমি। আই হ্যাভ বেটার থিংস টু ডু। থ্যাংকস।