
এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো নারীই বুলিং বা হেনস্তা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন। আর সেই নারী যদি হন গণমাধ্যমের পরিচিত মুখ, তবে সমালোচনা, কটাক্ষ কিংবা উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। তেমনি এক পরিচিত নাম উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়েও তাকে বারবার সামাজিক মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে।
সম্প্রতি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চ্যানেল আইয়ের বিশেষ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দীপ্তি। ঢাকার বিভিন্ন আসনে সরেজমিনে গিয়ে ভোটার ও প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলা, প্রত্যাশা ও প্রশ্ন তুলে ধরা- প্রতিটি পর্বেই ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। ভোটের আগে শেষ পর্বে তিনি মুখোমুখি হন প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির শীর্ষ নেতাদের— বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের। এই পর্বটি প্রচারের পরও বেশ প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। তবে এরমধ্যেও এক পক্ষ তাকে পক্ষপাতের অভিযোগে সমালোচনা করে, অন্য পক্ষ তাকে নিজেদের অনুকূলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।

তবে দীপ্তির বক্তব্য স্পষ্ট, ‘সাংবাদিক বা উপস্থাপকের কাজ কোনো পক্ষ নেওয়া নয়; বরং প্রশ্নের মাধ্যমে তথ্য ও সত্য উন্মোচন করা। আলোচনার ফল কোনো পক্ষের অনুকূলে বা প্রতিকূলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেটিকে ব্যক্তিগত অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা অনুচিত।’
তবে দীপ্তিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অপপ্রচার নতুন নয়। তার জন্য ফিরে যেতে হবে জুলাই আন্দোলনের সময়ে।
দীপ্তি চৌধুরীকে ঘিরে বড় আলেচনার সূচনা হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়। চ্যানেল আইয়ের টকশোতে সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (কারাবন্দী) তাকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে আখ্যা দেন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই ভিডিওতে দেখা যায়, দীপ্তি নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান’ উল্লেখ করে ওই মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তার এই দৃঢ় অবস্থান সে সময় অনেকের প্রশংসা কুড়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমে সমর্থন পায়।

জুলাই আন্দোলনের মাস কয়েক পর আবারও তাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়ায়। কিছু ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে তার ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান’ দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এমনকি একটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকের নাম ও লোগো ব্যবহার করেও একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে ওই দৈনিকটি তাদের অফিসিয়াল পেজ থেকে জানায়, এমন কোনো ফটোকার্ড তারা প্রকাশ করেনি; এটি সম্পূর্ণ ভুয়া।

দীপ্তিকে ঘিরে ভাইরাল হওয়া গুঞ্জনের সত্যতা যাচাই করতে জাতীয় দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’র ফ্যাক্টচেক বিভাগ অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দীপ্তি চৌধুরীর পারিবারিক পটভূমি তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে দীপ্তি চৌধুরীও তার পরিবারের মুক্তিযুদ্ধের অবদানের দলিলসহ প্রমাণ হাজির করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দীপ্তির দাদার বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে। তার বাবা শিবলী চৌধুরী এবং দাদা নুরুল ইসলাম চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের সময় নুরুল ইসলাম চৌধুরী অষ্টগ্রাম এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। তিনি আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তার অস্ত্র জমা দেয়ার কাগজ পাওয়া গেছে ।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শিবলী চৌধুরীর দুই চাচা কুতুব উদ্দীন চৌধুরী ও গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী, জয়নাল আবেদীন চৌধুরী তারা সরকারি সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। অষ্টগ্রাম উপজেলার সরকারি ওয়েবসাইটে তাদের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে (আইডি নম্বর যথাক্রমে ০১১৭০৭০০০১২ ও ০১১৭০৭০০০২)। কুতুব উদ্দীন চৌধুরী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক; গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী প্রয়াত। জয়নাল আবেদীন চৌধুরীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সই করেন স্বয়ং আতাউল গণি উসমানী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।
বারবার একই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে এমন হেনস্তার প্রেক্ষিতে দীপ্তি চৌধুরী বলেন, এরকম কুচক্রী মহল সবযুগেই সকল দায়িত্বশীল সৎ মানুষের পেছনে লাগে। সমস্যা হলো যারা এসব জেনে বুঝেও প্রতিবাদ করে না। আমি কখনোই নিজের পরিবারের পরিচয় নিয়ে অনেক কথা বলতে আগ্রহী না; মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে আমার পরিবার কখনো কোনো সুযোগও নেননি। বাধ্য হয়ে এখন এসব জবাব দিতে হচ্ছে। তবে আমি এটা মেনেই নিয়েছি যে ভালো কাজ করলে মানুষ পেছনে লাগবেই।